করোনাকালীন সাংবাদিকতা

প্রকাশিত: ৩:৪৪ পূর্বাহ্ণ, মে ২০, ২০২১

বাংলাদেশের সাংবাদিকগণ তাৎপর্যপূর্ন ইতিবাচক ভূমিকার স্বাক্ষর রেখেছেন। একটি দেশের সাংবাদিক, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, চেয়ারম্যান, মেয়র, এমপি, মন্ত্রী যদি সৎ, যোগ্য, বাস্তববাদী হয় তবে যে কোন ধরনের উন্নতি করতে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমাদেশের ওই সব মানুষ গুলি কতটা সৎ, তার নমূনা হিসেবে দেখা যাচ্ছে বর্তমান করোনায় দেশ বেসামাল ত্রাণের চাল, ডাল, সোয়াবিন তেল চুরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, গরীবের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার খাদ্য সহায়তার ২ হাজার ৫ শ টাকায় ভাগ বসিয়েছেন, এক ব্যক্তি এক মোবাইল সিমে অনেক বার টাকা নেওয়ায় সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
সংবাদপত্রকে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনিবার্য এক উপাদান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সাংবাদিকদের জাতির বিবেকও বলা হয়। সাংবাদিকগণ হচ্ছেন জাতির জাগ্রত বিবেক। আর সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের দর্পণ, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তাই সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকতা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনে। সংবাদপত্রের যাত্রা যথেষ্ট প্রচীন হলেও বিংশ শতাব্দিতে সংবাদপত্র বিভিন্ন দেশীয় আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ন ভূমিকা পালন করেছিল, বর্তমানেও করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন যে সব নেতা বা জনপ্রতিনিধি ২/ ১০ কেজি চাউলের লোভ সামলাতে পারে না তারা ভিক্ষে করুক। এ ব্যপারে কঠোর অবস্থানের পরেও থেমে নেই। আর এসব জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের নিউজ করে গিয়ে সাংবাদিকদের হতে হচ্ছে হয়রানির স্বীকার ও প্রভাবশালীদের সন্ত্রাসী বাহনীর দ্বারা প্রহৃত হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। করোনাকালিন সাংবাদিকতা পেশাটি দিন দিন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। আর মফস্বল সাংবাদিকগণ বেশী ঝঁকিতে রয়েছে। সংবাদপত্রের অবস্থাও ভাল নেই করোনালীন অনেক সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে। সাংবাদিক চাকুরি হারাচ্ছেন। তাদের বেতন ভাতা কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংবাদপত্রের ইতিহাসের দিকে একটু লক্ষ্য কারা যাকঃ
১৫৬৬ সালে ভেনিসে হাতে লেখা সংবাদ প্রচার করা হতো। চারটি কাগজ একসঙ্গে গোল করে পেঁচিয়ে পাঠকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো সপ্তায় সপ্তায়। ইতালি ও ইউরোপের যুদ্ধ ও রাজনীতির খবর থাকত এসব কাগজে।
১৬০৯ সালে প্রথম ছাপা সংবাদপত্র বের হয় জার্মানি থেকে, জোহান ক্যারোলুসের উদ্যোগে। জার্মান ভাষায় প্রকাশিত রিলেশন নামের এই পত্রিকাটি ছিল সাপ্তাহিক। ইংরেজি ভাষার প্রথম সংবাদপত্র বের হয় আমস্টার্ডাম থেকে, ১৬২০ সালে। ফ্রান্সের প্রথম পত্রিকা বের হয় ১৬৩১ সালে এবং আমেরিকার প্রথম সংবাদপত্র বের হয় ১৬৯০ সালে। ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র বেঙ্গল গেজেট। ১৭৮০ সালের জানুয়ারিতে জেমস অগাস্টাস হিকির সম্পাদনায় বের হয়। চার পাতার এই পত্রিকার আকার ছিল ১২ ইি বাই ৮ ইি । পতুর্গিজরাই প্রথম ভারতে মুদ্রণযন্ত্র নিয়ে আসে।
বাংলাদেশে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক এরকম বিভিন্ন প্রকারভেদের পত্রিকা রয়েছে। দেশের সকল প্রধান জেলাসমূহে এসব পত্রিকা পাওয়া যায়। তবে শুধুমাত্র জেলাভিত্তিক পত্রিকাও ছাপা হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে কোন দৈনিকের সান্ধ্যকালীন সংস্করণ প্রকাশ হয় না। তবে প্রচলিত ব্রডশীটের পত্রিকার পাশাপাশি সম্পূর্ণ অনলাইন ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ ছাপানো পত্রিকারও অনলাইন সংস্করণ দেখা যায়।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের নিবন্ধন শাখা থেকে সংবাদপত্রের নিবন্ধন প্রদান করা হয়। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত ৩০শে জুন ২০১৮ তারিখের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত পত্র-পত্রিকার সংখ্যা ৩০৬১টি (অনলাইন গণমাধ্যম অন্তর্ভূক্ত নয়) যার মধ্যে ১২৬৮টি ঢাকা থেকে এবং ১৭৯৩টি অন্যান্য জেলা থেকে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে দৈনিক ১২১৩টি, অর্ধ-সাপ্তাহিক ৩টি, সাপ্তাহিক ১১৮১টি, পাক্ষিক ২১৩টি, মাসিক ৪১০টি, দ্বি-মাসিক ৮টি, ত্রৈ-মাসিক ২৮টি, চর্তুমাসিক ১টি, ষান্মাসিক ২টি এবং বার্ষিক ১টি পত্রিকা রয়েছে।
আগে বলা হয়েছে মহৎ পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে সারা বিশ্বে ‘ফোর্থ স্টেট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এটি শুধু বলার খাতিরে বলা নয়। হাতিয়ার হিসেবে সাংবাদিকতা সৎ রিপোর্টিংকে এর মৌলিক ভিত্তি হিসেবে এবং রিপোর্টিংয়ের সঠিকতাকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে বলেই সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আজকের এ জটিল টালমাটাল বিশ্বে সাংবাদিকতা নিজেকে সঠিক অবস্থানে ধরে রাখতে পেরেছে। এ রকমটা না করতে পারলে সাংবাদিকতা হয়ে যেত শুধু একটা ব্যবসার ব্যাপার।
সাংবাদিকতার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে স্পেনের গৃহযুদ্ধ কাভার করার সময় ব্রিটিশ সাংবাদিক ও গবেষক হেমিংওয়ে বলেছিলেন, ‘আমি হলাম সেই তাঁতি যার প্রতিদিনের বুননে উঠে আসে জাতির শোক, সুখ, জয়গানের গল্প।’ সংবাদপত্র হল রাষ্ট্রের দর্পণ। আর সাংবাদিকরা হলেন জাতির বিবেক। সাংবাদিকতাকে বলা হয় নির্মাণ বা ধ্বংসের গদ্য। সাংবাদিকতা জাতির চিন্তা-চেতনার শৈলী ও সুপ্ত মনমানসিকতা সৃষ্টিতে বা বিনাশে কতটুকু ভূমিকা পালন করে, তা কোনো বুদ্ধিমান, সচেতন ও বিবেকসম্পন্ন মানুষের কাছে অস্পষ্ট নয়। মানবতার অতন্দ্র প্রহরী সৎ সাংবাদিকরা দেশ ও জাতির শেষ ভরসা। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা জাতির জাগ্রত বিবেক এবং পাঠকরাই হচ্ছেন তার প্রাণশক্তি। তবে ভুয়া খবর মানুষের মধ্যে সাংবাদিকতা সম্পর্কে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি করে, এ কথা সবার জানা।
এ ছাড়াও ভাষার ওপর ভালো দখল থাকলে একজন সাংবাদিক একটি বিষয়কে পুরোপুরি ড্যামেজ করে দিতে পারেন অথবা একই বিষয়ের চিত্র পাল্টেও দিতে পারেন। উদাহরণগুলো সঠিক সাংবাদিকতার পর্যায়ে পড়ে কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে। কেউ কেউ এ রকম সংবাদকে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বলে থাকে। হলুদ সাংবাদিকতার প্রচলন বহু আগে থেকেই। একশ্রেণির দুষ্টু, স্বার্থশিকারি সাংবাদিক হলুদ সাংবাদিকতার আশ্রয় নিয়ে তাদের টার্গেট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেয় করে স্বার্থসিদ্ধির অপপ্রয়াস চালায়। হলুদ সাংবাদিকতা যেহেতু তথ্য ও সত্যকে আড়াল করে মনগড়া সংবাদ পরিবেশনের সঙ্গে জড়িত, সেহেতু এরূপ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সৎ সাংবাদিকরা সব সময় সোচ্চার।
অতিরঞ্জিত তথ্য পরিবেশন বা গুজব ছড়ানো কিংবা ‘ভীতিজনক’ শিরোনাম দিয়ে পাঠক/দর্শককে আকৃষ্ট করার মানসে হলুদ সাংবাদিকতা ব্যবহার করা হয়। এতে পত্রিকার কাটতি কিংবা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার আকর্ষণ হয়তো সাময়িক বাড়ে; কিন্তু পরিণামে জনমানুষের কোপানলে পড়ে বিধ্বস্ত হয়ে যায়।
করোনাকালে দেশের উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহর থেকে প্রকাশিত ৪৫৬টি স্থানীয় সংবাদপত্রের মধ্যে ২৭৫টি (৬০.৩১%) সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। অনিয়মিত অর্থাৎ বিজ্ঞাপন পেলে অথবা অর্থসংস্থান হলে ১৮টি (৩.৯৫%) সংবাদপত্র প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক (বিআইজেএন) এর এক জরিপ এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্চের করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকে প্রায় সব স্থানীয় সংবাদপত্র পুরোপুরি কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এরপরে এসব কাগজের মধ্য থেকে উল্লিখিত সংখ্যক সংবাদপত্র নিয়মিত এবং অনিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। কমপক্ষে ছয়টি জেলায় কোনো সংবাদপত্র আর প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্রমাগত দুর্বলতা আরও সংকীর্ণ ও দুর্বল হয়ে পড়বে। যা পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও কাঠামোর জন্য একটি বড় ধরণের ক্ষতি।
স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও মুক্ত সংবাদমাধ্যমে পেশাদার সাংবাদিকতায় আগ্রহীদের সংখ্যা কমে যাবে।
সংবাদপত্রের অবস্থা সারাবিশ্বে কোথাও ভালো নেই। চলমান করোনাকালে অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়েছে। সংবাদপত্রের ইতিহাসে এমন অবস্থা অতীতে আর কখনো হয়নি। করোনাকারণে বিশ্ব একটা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা অভূতপূর্ব। সব দেশের অর্থনীতিই ভেঙ্গে পড়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি সর্বকালের সবচেয়ে ভয়াবহ মন্দার সম্মুখীন। অর্থনীতির অবর্ণনীয় দুর্দশায় প্রতিটি দেশের এমন কোনো খাত নেই যা, আক্রান্ত ও বিপন্নদশায় উপনীত না হয়েছে। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। করোনার ধাক্কা সব ক্ষেত্রে লেগেছে। সবচেয়ে বেশি লেগেছে সংবাদপত্র, ব্যাপক অর্থে মিডিয়ায়। সংবাদপত্রের আয়ের উৎস সার্কুলেশন ও বিজ্ঞাপন। করোনাকালে এ দু’টি উৎসই অতিশয় ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। লকডাউনের সময় সংবাদপত্র দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় তো পরের কথা, জেলা শহরেও পাঠানো সম্ভব হয়নি। তবে এখনো সাবেক অবস্থায় যেতে অনেক বাকী। আদৌ সাবেক অবস্থায় যাবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বিজ্ঞাপন কমেছে বললে ভুল হবে, নেই বললেই চলে। এমতাবস্থায়, সংবাদপত্রগুলো চরম আর্থিক সংকটে পতিত হয়েছে। এর ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধ্বংসোন্মুখ সংবাদপত্র রক্ষায় কর্তৃপক্ষীয় তরফে নানা রকম পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে। কোনো কর্তৃপক্ষ বেতন কমিয়ে দিয়েছে সাংবাদিক ও কর্মচারীদের, কোনো কর্তৃপক্ষ কর্মী ছাঁটাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে, কোনো কর্তৃপক্ষ আবার অনেককে বাধ্যতামূলক ছুটি দিয়ে দিয়েছে বিনা বেতনে।
লেখক: জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিক ও কলামিষ্ঠ । বিশেষ প্রতিনিধি ঃ দৈনিক আমার সময়।
মোবাইল নং ০১৭৪৯৩৩৬২৮৫

Print Friendly, PDF & Email