একটি ফাঁসির মঞ্চ অত:পর চিৎকার

প্রকাশিত: ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২১

সৈয়দ মুন্তাছির রিমনঃ একজনকে হত্যা করা হলো। তার দায়ে বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয় হলো। তাই এই রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। নিদিষ্ট সময় ১২.০১ মিনিটে ফাসিঁ দেয়া হবে। এরই মধ্যে এলাকার দায়িত্বরত জেলা প্রশাসক,পুলিশ সুপার,সিভিল সার্জন ডিআইজি উপস্থিত হওয়া দৌড়ে ব্যস্ত। ৭১ স্বাধীনতার পর এটাই জেলা কারাগারে প্রথম কোন আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হবে। কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক কারাবন্দি জল্লাদ হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে। তাকেও নিয়ে আসা হয়েছে। সময়ের তালে তালে জেলা কারাগার ব্যস্ত হয়ে উঠছে।  আজ যাকে কেন্দ্র করে পুরো কারাগারে কর্মচাঞ্চল্যতা। সেই ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এই নিরবতার কারণ তাকে জানতে দেয়া হয়নি। তার অজান্তে তাকে নিয়ে কারাগারে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্ন এক পরিবেশ। আসামীকে কয়েক ঘণ্টা পরই ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে। আসামী কনডেম সেলে বন্দী অবস্থায় শুয়ে বসে সময় কাটাচ্ছেন অন্যান্য দিনের মতোই। যখন কারাগারে তার বন্দী জীবন শুরু হয়, তখন তার বয়স ছিল ৩৩। এখন তার বয়স ৫২ বছর। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ১৯ বছর কারাগারে বন্দী জীবনের অবসান ঘটবে। বিকালেই কারাগারের ফাঁসির সেলের কাছে হঠাৎ আত্মীয়স্বজনকে দেখে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। অন্যান্য সময়ে যেভাবে তাকে দেখতে আসতেন, সে রকম সাধারণ দিনের মতোই ভেবেছে আসামী। কিন্তু এব্যাপারে কর্তৃপক্ষ আত্মীয়স্বজনকে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলতে বারণ করেছে। করোনাকাল। যে কারণে যারা দেখতে আসতে পারেনি,তাদের সঙ্গেও আসামীকে মোবাইলে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপরও আসামী ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। তার প্রিয় স্বজনদের সঙ্গে দেখাই শেষ দেখা। ইতিমধ্যে সব যোগাযোগ সম্পুর্ণ হয়ে গিয়েছে। সবাই সন্ধ্যার মধ্যেই চলে গেছে। 

আবারও সে একা সময় পার করছে। আত্মীয়রা সঙ্গে করে কিছু খাবার এনেছিল। আর এনেছিল তার প্রিয় আম। তাকে সেই আম কেটে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খাননি। প্লেট ভর্তি আম রয়ে গেছে। 

একজন ডেপুটি জেলার কয়েকজন কারারক্ষীকে নিয়ে গেলেন সেই কনডেম সেলে। আসামী শুয়ে আছে। কারা কর্মকর্তার ডাকে সে উঠে বসলো। ডেপুটি জেলার তাকে বললেন, আপনাকে প্রস্তুত হতে হবে। আর কিছুক্ষণ পরই যেতে হবে। এটাই জীবনের শেষ সময় আপনার। ডেপুটি জেলারের মুখে এমন ভয়ংকর কথা শুনে কিছু বললো না আসামী। কথাটা শোনা মাত্রই সামনে রাখা প্লেট ভর্তি আমের দিকে তাকালো। নির্বাক নিরবে আমের টুকড়া হাতে নিয়ে মুখে দিলো। সে খেতে থাকলো অবিরাম। একটা শেষ হতে আরেকটা। একটার পর একটা। তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে। অন্য কোথাও তাকাচ্ছেন না। তার দৃষ্টি আমের প্লেটে। সেদিকে তাকিয়েই খেয়ে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছিল দৃষ্টি সরালেই হয়তো কেউ আম সরিয়ে নেবে। চোখ তার সরেনি প্লেট ভর্তি আম শেষ না হওয়া পর্যন্ত। সে কোনো কথা বললো না। তার জবান বন্ধ। 

কিছুক্ষণ পর ডেপুটি জেলার তাকে জিজ্ঞাস করলেন, আর কিছু খেতে মন চায় কি না? কিন্তু তার জবান বন্ধ। পুনরায় ডেপুটি জেলার তাকে প্রস্তুত হতে বলে চলে গেলেন। এরপর আসলেন জেলা কারাগার মসজিদের ইমাম। তাকে গোসলের পর অজু করতে বলেন। এরপর তওবা পাঠ করান তাকে। একদম ধীর স্থির হয়ে যায় আসামী। কোনো কথাই ছিল না তার মুখে। ইতিমধ্যে সময় ঘনিয়ে আসে।

রাত ১১.৪৫ মিনিটে তার সেলে যান জেলার, ডেপুটি জেলার, কারারক্ষী আর জল্লাদের সহযোগী। কালো রঙের জমটুপি পরিয়ে ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মঞ্চের দিকে। হাতে লাগানো হ্যান্ডকাফ। কিছুই বলছে না। বাধাও দিচ্ছে না আসামী। তার কোনো বিকার ছিল না। তাকে দাঁড় করানো হয় মঞ্চে। জল্লাদ তার গলায় পরিয়ে দেন ফাঁসির দড়ি। সেখান থেকে সরে মঞ্চের হাতল নিয়ে প্রস্তুত হলেন। পিনপতন নিস্তব্ধতা। জেলসুপার তার বাম হাত উঁচু করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছেন। আরেক হাতে তার লাল রুমাল। 

 

১২টা ০১ মিনিটেই তার হাতের রুমাল ছেড়ে দেবেন। জল্লাদ তখনই হাতল ধরে টান দেবেন। আসামী পায়ের নিচের দুই পাটাতন দুই পাশে সরে যাবে। ঝুলে পড়বে আসামী। 

এমনই এক শাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। আর মিনিট সময় আছে। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা ঘুরছে। জল্লাদ হাতলে হাত রেখে তাকিয়ে আছেন জেল সুপারের হাতের রুমালের দিকে। 

আর দশ সেকেন্ড! ঠিক তখনই আসামীর জবান খুলল। সে চিৎকার করে বলে উঠলো, আমি খুন করিনি। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন। সময় আঁতকে ওঠেন উপস্থিত সবাই। বলে কী লোকটা। কিন্তু আসামী শেষ শব্দটাই ছিল জীবনের শেষ মুহূর্ত। রুমাল শূন্যে ভাসছে। জল্লাদ ততক্ষণে হাতল টেনে ধরেছেন। ফাঁসির দঁড়িতে ঝুলছে আসামী। 

অবশেষে বলতে চাই ঘটনাটি কাল্পনিক নয়। বাস্তব ঘটনার রাজস্বাক্ষীর জবানবন্দী। ফাঁসির আসামী আদালতের রায়ে দণ্ডিত ব্যক্তি। 

এভাবেই চলতি বছর ২০২১ সালে জুন বুধবার দিবাগত রাত ১২টা এক মিনিটে দিনাজপুর জেলা কারাগারে প্রথম ফাঁসি কার্যকরের বর্ণনা মাত্র। কিন্তু তার শেষ কান্না বা আবেদনের আর্তনাদের কোন উত্তর কারও জানা নেই। আর কোন দিন কেউ জানতে পারবেও না। শুধু আদালতের বিচার কি মানবতা নামক সত্বাকে চিরদিনের জন্য কাফনের কপিনে ডেকে দিলো? মনে শত প্রশ্ন উকি দেয়ফাসিঁ দিয়ে কি আমরা শান্তি নামক পৃথিবীকে গড়ে তুলতে পারবো। আর নির্মূল করতে পারবো অপরাধ। যেখানে আজো আমার আদালত গুলো রেড ফোনের ইশারায় বন্দী। 

জনক: সাংবাদিক কলামিস্টফ্রান্স।

Print Friendly, PDF & Email