সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস বিষয়ে জাসদের গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত

প্রকাশিত: ১:৪৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২১

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আজ ২৫ অক্টোবর সোমবার সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কনফারেন্স হলে ‘সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস: রাষ্ট্র ও রজনৈতিক দলের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ গোলটেবিল আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি এবং মূল প্রবন্ধ উত্থাপন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি। গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলির সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানক এমপি, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারি এমপি, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদত হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য অধ্যাপক ড. সুশান্ত দাশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রখ্যাত অনুপ্রাণ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি এড. কাজল দেবনাথ।

সভায় নিম্মের মূল প্রবন্ধ উত্থাপিত হয়।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি আয়োজিত
গোলটেবিল আলোচনা
বিষয়: সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস: রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকা
২৫ অক্টোবর ২০২১, সোমবার, সকাল ১১ টা
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কনফারেন্স হল, জাতীয় প্রেসক্লাব
সুধি মণ্ডলি,
সংগ্রামী শুভেচ্ছা জানবেন।
অতিসম্প্রতি সার্বজনীন শারদীয় উৎসব দুর্গা পুজাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্গা পুজা মণ্ডপ, মন্দির, হিন্দুদের ঘর-বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন, হত্যা, প্রাণহানীর ঘটনায় অত্যন্ত ব্যাথিত ও ক্ষুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আমরা আজ এখানে মিলিত হয়েছি। আমরা শুরুতেই আমাদের দল ও এই গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সকলের পক্ষ থেকে নিহত-আহত-ক্ষতিগ্রস্থদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।
আমাদের দল জাসদ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ন্যাক্কারজনক সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে নিয়ে তাৎক্ষণিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মধ্যেই থেমে যাওয়া, আটকে থাকা এবং পরবর্তী ঘটনার জন্য অপেক্ষা করাকে সঠিক বিবেচনা করছি না। সেই বিবেচনা থেকেই আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। আমাদের দল বিশ্বাস করে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি জনগণকে সাথে নিয়ে সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ ধারাবাহিক লাগাতার রাজনৈতিক অবস্থান ও পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে। আমি এখন এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য ও বিবেচনা আপনাদের সামনে উত্থাপন করছি।
এবারের ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রকোপ কিছুটা কমে আসার ফলে দুই বছর পর এবার ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে বত্রিশ হাজারের বেশি মণ্ডপে সার্বজনীন শারদীয় উৎসব দুর্গাপুজা শুরু হয়। আনুষ্ঠানকিভাবে পুজা শুরুর আগে ককেয়টি স্থানে প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটলেও শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমূখর পরিবেশেই পুজা চলছিল। শারদীয় দুর্গাপুজার অষ্টমীর দিনে কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ে একটি পুজামণ্ডপে সবার অগোচরে কোরআন শরীফ রেখে তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে হামলা করা হয়। কুমিল্লার ঘটনার পর দেশের বেশ কয়েকটি জেলা-উপজেলায় পুজামণ্ডপ-মন্দির-ঘরবাড়িতে হামলা-ভাংচুর-লুটপাট-অগ্নীসংযোগ-নির্যাতন-হত্যা ঘটে। নিমিষেই আনন্দ উৎসব বিষন্নতায় ছেয়ে যায়। সংখ্যার বিচারে আক্রান্ত মণ্ডপ-মন্দিরের সংখ্যা কম হলেও এটাকে কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায়? কুমিল্লার ঘটনা ঘটানোর পর এতোগুলো জেলা-উপজেলায় ঘটনা ঘটলো কিভাবে? এসব হামলা কি কিছু মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া? না-কি ওছিলা তৈরি করে আক্রমণের জন্য ওৎপেতে থাকা গোষ্ঠীর সুপরিকল্পিত হামলা?
আমাদের দল মনে করে, এ হামলা কিছু মুসলমানের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ওৎপেতে থাকা গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। কারণ ‘কোরআন অবমাননা, নবীর অবমাননা’ ইত্যাদি বলে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলছে। প্রতিবার ঘটনার পর প্রতিবাদ, মামলা হয় কিন্তু পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়না। এবারও সরকার ও প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। মামলা হয়েছে, সন্দেহভাজন অপরাধীরা গ্রেফতার হয়েছে। সমগ্র দেশেই প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা হচ্ছে না।
আমাদের দল মনে করে, হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘুদের উপর হামলার পিছনে রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক সীমানাপার কারণ বিদ্যমান রয়েছে।
রাষ্ট্রের দূর্বলতা
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দ্বি-জাতি তত্ত্বের কবর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি সংবিধান উপহার দেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান অনুযায়ী সদ্য স্বাধীন দেশ-রাষ্ট্র-সমাজ বিনির্মাণ ও লালনে দূর্বলতা এবং ঘাটতি ছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা-অনুশীলন-লালন, রাষ্ট্র-রাজনৈতিক আচারে দূর্বলতা ও ত্রুটি ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর জিয়া-এরশাদ সামরিক শাসনামলে কবর থেকে দ্বি-জাতি তত্ত্বের পচা-গলা লাশ তুলে এনে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছড়ানো হয়েছে। সংবিধানে বিসমিল্লাহ্, রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে ঢুকিয়ে গিয়েছে। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ধারক-বাহকদের রাষ্ট্র-রাজনীতি-সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার সেই বিষবৃক্ষ বিষফল দিয়েছে। বিষফলের বীজ থেকে নতুন করে বিষবৃক্ষ জন্ম নিয়ে রাষ্ট্র-সমাজকে বিষাক্ত করেই চলেছে।
রাজনৈতিক দলের দূর্বলতা
ষাট দশকে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম-স্বাধীনতা সংগ্রাম-১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এমনকি ৭০-৮০ দশকে সামরিক শাসন কবলিত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ ও নীতিতে যতটা অটল, শক্তিশালী, আপসহীন ছিলÑ আজ তা অনেক দূর্বল হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ভিতর থেকে অসাম্প্রদায়িক আদর্শের শক্তি অনেক কমে গিয়েছে। রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়েরর নেতা-কর্মীরা নিজেরাই অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ভুলে গিয়েছে, পরিত্যাগ করেছে। ‘ধর্মপ্রাণ’ হতে গিয়ে ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক হচ্ছে। রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে নিজেদের ‘ধর্মপ্রাণ’, ‘ভাল মুসলমান’, ‘ভাল হিন্দু’ ইত্যাদি প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্মপরায়ণতা ও ধর্মান্ধতার পার্থক্য মুছে ফেলা হচ্ছে।
সাম্প্রদায়িক ও ধর্মনির্ভর রাজনীতির উত্থান
দূর্ভাগ্যজনকভাবে সামরিক শাসকদের তৈরি দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এবং তাদের মদদে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত জামাতসহ স্বাধীনতা বিরোধী, দেশবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি, ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক শক্তি নতুনভাবে নানা নামে গড়ে উঠা সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ, ধর্মান্তরিত রাজনৈতিক শক্তিসমূহ সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়েই চলেছে। এ সকল ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের সাথে অংশীদারিত্বের রাজনীতি চলছে। এই অংশীদারিত্বের রাজনীতির পথেই যুদ্ধাপরাধীদের সাথে নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইনের আদালত প্রকাশ্য বিচার ও দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বিচার রায় সমুন্নত রাখার পরও যুদ্ধাপরাধের বিচারকে আলেম ওলামাদের বিচার-ইসলাম বিরোধী বিচার হিসাবে চিহ্নিত করে সহিংসতার রাজনীতি হয়েছে।
রাষ্ট্র-প্রশাসনে সাম্প্রদায়িকতার ভূতের আছড়
রাষ্ট্র-প্রশাসনে বিদ্যমান সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন অংশ না। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধ রাজনীতির প্রভাবে রাষ্ট্র-প্রশাসন-প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে এমনকি আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যের আচরণ ও কর্মকাণ্ডও প্রতিফলিত হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট যুদ্ধপরাধের অভিযোগে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিচার চলাকালে তাকে দেশ-জাতি-মানবতার বিরুদ্ধে ঘোরতর অপরাধী না হিসাবে দেখে তাকে একজন ‘আলেম’ হিসাবে দেখে ‘হুজুরে’র সান্নিধ্য লাভের জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্লজ্জ প্রতিযোগীতার ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একই ঘটনা ভাস্কর্য ভাঙ্গাসহ মোমিনুল হক গ্রেফতার হবার পর একজন পুলিশ সদস্য মোমিনুলের পক্ষে ফেসবুক লাইভে বক্তব্য দেয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাতেও সরকার, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকার পরও আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীর প্রস্তুতিহীনতা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, ধীরে চলার ঘটনার অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গণে সাম্প্রদায়িকীকরণ
পরিবারের পর শিশুদের মানস গঠনে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দূর্ভাগ্যক্রমে আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গণ সাম্প্রদায়িকীকরণের কবলে পতিত। স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে চরম সাম্প্রদায়িক নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের একটি বড় অংশ সুপরিকল্পিতভাবে শিশু মনেই সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করছে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে আমেরিকাসহ পশ্চিমা দুনিয়ার ‘দ্বৈত নীতি’ ও ‘ইসলামভীতি’ থেকে ‘মুসলিম বিদ্বেষ’, ফিলিস্তিন-ইসরাইল নীতি, ইরাক-সিরিয়া-আফগানিস্তান নীতির প্রতিক্রিয়া হিসাবে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান হয়েছে। আবার খোদ আমেরিকারই এই রাজনৈতিক ইসলামের ধারক আলকায়দা-আইএস-তালেবান তৈরির পিছনেও হাত ও পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক এই পরিস্থিতির প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এক দেশে যারা ধর্মীয় বা জাতিগতভাবে সংখ্যাগুরু আরেক দেশে তারা সংখ্যালঘু। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার যে কোন দেশে ধর্মীয় ও জাগিত সংখ্যালঘুদের উপর বৈষম্য বা নির্যাতনের সীমাপার প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
আক্রমণ শুধু হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের উপরই নয়, আক্রমণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে
ধর্মের অজুহাত তুলে শুধুমাত্র হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের উপর হামলা আক্রমণ হচ্ছে না। আক্রমণ হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভিত্তি-রাষ্ট্রের প্রতীকের উপর। ধর্মের দোহাই দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধীতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, দেশের বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলেছে। ভাস্কর্যের বিরোধীতা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামে নজিরবিহিন সন্ত্রাস ও সহিংসতার রাজত্ব কায়েম করেছিল। এরা এদের পছন্দের ধর্মীয় মতকেই সকল মুসলমানের উপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে ইসলাম ধমের শান্তির শান্তিবাদী ধারা, সুফিবাদ ও মরমীবাদের উপর হামলা করছে। পীর-দরবেশের মাজারে হামলা করছে। এরা ঈদেমিলাদুন্নবী, শবেবরাত পালন, ঈদে কোলাকুলি, করমর্দন, নফল নামাজ পড়া, জিকির-আসকারে পর্যন্ত বিরোধীতা করছে। পহলা বৈশাখ, নববর্ষ পালনসহ বাঙালির ঐতিহ্যবাহি সংষ্কৃতি, উৎসব, মেলার বিরোধীতা করছে। এরা ধর্মকে মানুষের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে।

পরিস্থিতি মেনে নিয়ে সহ্য করা, না-কি প্রতিরোধ
ধর্মের দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক নির্যাতন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ধ্বংস করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শের একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানানোর চলমান রাজনীতির দাপট সহ্য করতে শুরু করবো, না-কি প্রতিরোধ গড়ে তুলবো? বাঙালি জাতিসহ এ ভূখন্ডের জনগণের ইতিহাস হচ্ছে অন্যায়-অত্যাচার-বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা। সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাজনীতির দাপট মেনে নেয়া মানে মুক্তিযুদ্ধের অসম্মান, শহীদদের অসম্মান, বাংলাদেশের অসম্মান মেনে নেয়া।

আমরা জাসদ মনে করি, পরিস্থিতি যতই বিরূপ হোক, দেশ বিরোধী শক্তি যতই শক্তি সঞ্চয় করুক, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার অন্ধকার যতই আচ্ছন্ন করুকÑ প্রতিরোধের সূচনা করতে হবে। প্রতিরোধের পথেই বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধসহ অতীতের সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামের চেতনায় জাতীয় ঐকমত্য ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে জাতীয় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের সূচনা এবং ধারাবাহিক মাটি কামড়ে লেগে থাকলে জাতীয় পুনর্জাগরণ সম্ভব এবং বাংলাদেশের শত্রুদের পরাজিত করা সম্ভব।
হিন্দুদের উপর নির্যাতন প্রতিরোধের লড়াইটা হিন্দুদের উপর ছেড়ে না দেয়া, এটা হিন্দুদের একার লড়াই হিসাবে নেয়াটা ভুল হবে। সকল ধর্মের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে এক সাথে লড়াই করতে হবে। সকল ধর্মের মানুষদের মধ্যে বিশ্বাস-আস্থা-সংযোগ-যোগাযোগ-সম্প্রীতি-বন্ধুত্ব ঐক্যের পথেই অগ্রসর হতে হবে। লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতা আত্মঘাতি হবে, সাম্প্রদায়িক শক্তির পাতা ফাঁদেই পা দেয়া হবে।
প্রতিরোধ লড়াই শুরু হবে কোথা থেকে?
রাজনীতিই সমাজকে নেতৃত্ব দেয়। রাজনৈতিক অঙ্গণ থেকেই লড়াইয়ের সূচনাটা করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিজেদের দূর্বলতা, দ্বৈততা, মাঝামাঝি পথে চলা বন্ধ করতে হবে। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শিখাইয়ো’ এর মতই অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির ক্ষয়ে যাওয়া দূর্বল হয়ে যাওয়া অসাম্প্রদায়িক আদর্শ পুনরুদ্ধারের কাজটা দিয়ে শুরু করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিকে সকল ধরণের ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। কৌশলের নামে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
মীমাংসিত বিষয় ও ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করার রাজনীতি বন্ধ করতে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক ও ধর্মনির্ভর রাজনৈতিক দলের সাথে অংশীদারিত্বের রাজনীতি পরিহার করতে হবে।
ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গণকে সাম্প্রদায়িকীকরণ রুখে দিতে হবে।
অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য প্রশাসনের স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা বর্ণচোরা সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অসাম্প্রদায়িক প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান করতে হবে। প্রতিবার হামলার পর মামলা হয়, তদন্ত হয়, গ্রেফতার হয়। কিন্তু মামলা পরিচালনার ত্রুটি ও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধিরা ছাড়া পেয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে হিন্দু বা সংখ্যালঘুদের উপর হামলা করা হলে তার বিচার করার কেউ নাই। সাম্প্রদায়িক হামলা-হত্যার সকল ঘটনার বিচার করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক দলে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করতে হবে।
সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পুনরুত্থানে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব ও সরকার গুলিকে এক জায়গায় দাঁড় করানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বছরেই সংবিধান পর্যালোচনার বিশেষ সংসদীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধসহ অতীতের সকল গণতান্ত্রিক ও জাতীয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মীমাংসিত বিষয়সমূহ এবং ৭২ সালের মূল চেতনা ও বৈশিষ্ট্যের সাথে রাষ্ট্রধর্মসহ সকল সাংঘর্ষিক-অসংগতিপূর্ণ আইন বা অধ্যাদেশ দূর এবং সংবিধানের অন্যান্য সকল নির্দেশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে।
Print Friendly, PDF & Email