তিস্তায় অকাল বন্যার তিন মাত্রা

প্রকাশিত: ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২১

অখণ্ড বাংলায় হেমন্ত হলো ফসল তোলার ঋতু। কবি সুফিয়া কামাল লিখেছেন- ‘এই তো হেমন্ত দিন, দিল নব ফসল সম্ভার/অঙ্গনে অঙ্গনে ভরি, এই রূপ আমার বাংলার।’ হেমন্তের ফসল প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও নিরাপদ। গঙ্গা-যমুনা অববাহিকায় যে ঝড় ও বন্যা ফসল খেয়ে যায়, হেমন্ত তা থেকে বহুলাংশে মুক্ত। বর্ষার প্রমত্ত নদী শরতে এসে শান্ত হতে থাকে এবং হেমন্তে একেবারে স্থির হয়ে যায়। কিন্তু তিস্তা অববাহিকার পাঁচ জেলা- নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় কার্তিকের প্রথম সপ্তাহে এক প্রলয়ঙ্করী বন্যা এসে যেভাবে হেমন্তের ফসল খেয়ে গেল, তা বহু বছর দেখা যায়নি।

বর্ষা ও শরতের মৌসুমি বন্যার সময় পার করে তিস্তার চরে চরে কৃষক আবার আমন ধান বুনেছিল। সেই ধান কেবল সোনালি রং ধারণ করেছিল। বালু ও দোআঁশ মাটির চরাঞ্চলে এটাই প্রধান ফসল। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে যোগ হয়েছে মিষ্টিকুমড়া, বাদাম ও আলু। কোথাও কোথাও শীতের আগাম সবজি। মাত্র দিন দুয়েকের অকাল বন্যায় সব বালুচাপা পড়ে গেছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেখছি, বিষণ্ণ কৃষক ‘মাটি খুঁড়ে’ বালুচাপা পড়া ধান ও অন্যান্য ফসল ‘উদ্ধার’ করছে। প্রধান ফসলের এমন পরিণতি কতটা হৃদয়বিদারক, তা কেবল কৃষকই জানে।

তিস্তা অববাহিকায় বন্যার তোড় যখন নেমে এসেছিল, তখন ছিল কোজাগরি পূর্ণিমার কাল। বাঙালি হিন্দুর লক্ষ্মীপূজার তিথি। হিন্দু ধর্মবিশ্বাস-মতে, লক্ষ্মী ধনসম্পত্তির দেবী। কোজাগরি কথাটা এসেছে ‘কে জেগে আছ’ থেকে। পুরাণমতে, দেবী লক্ষ্মী এই রাতে ভক্তের ঘরে ঘরে ঘুরে ঘুরে খোঁজ নেন- কে জেগে আছে। এবার তিস্তা অববাহিকায় ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে সবাই জেগে ছিল বন্যার তোড় থেকে বাঁচতে। কিন্তু কিছুই বাঁচেনি। সম্পদশালী কিংবা সম্পদহীন, সবাইকে যেন মুহূর্তেই নিঃস্ব করে দিয়ে গেছে এবারের বন্যা।

মৌসুমি বন্যা থেকে এই অকাল বন্যা কতটা বেশি ভয়ংকর ছিল; তা বন্যা নেমে যাওয়ার পর আরও বেশি বোঝা গেছে। ফসল বালুর তলে তো তলিয়ে গেছেই, ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ঘরদোর। ক্ষতবিক্ষত হয়েছে সড়ক, বাগান ও ফসলি জমি। বন্যা-পরবর্তী যেসব আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে, সেখানে দেখা গেছে ধ্বংসাবশেষের মুখ-ব্যাদান করা চিত্র।

অথচ ঋতুচক্র ও প্রকৃতি মানলে এই বন্যা হওয়ারই কথা ছিল না। হেমন্তকালেও পাহাড়ি অঞ্চলে বর্ষাকালের মতো ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিশেষত, সমুদ্রে যদি নিম্নচাপ দেখা দেয়। বর্ষণের ধারা নদী বেয়ে নেমেও আসতে পারে। কিন্তু তার জের ধরে এমন প্রলয়ঙ্করী বন্যা কে কবে দেখেছে! এই বন্যার তিনটি মাত্রা রয়েছে।

প্রথমত. এই বন্যা যতটা না প্রাকৃতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি মনুষ্যসৃষ্ট। এটা ঠিক, তিস্তার উজানের অংশে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে স্বল্পসময়ে ব্যাপক বর্ষণ হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেই পানি গড়িয়ে তিস্তা নদীতে নেমেছে। পথের মধ্যে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজে এসে তা প্রথম দিকে আটকে ছিল। যখন ব্যারাজের উজানের অংশ আর পানি ধরে রাখতে পারছিল না, তখন এর সব জলকপাট খুলে দেওয়া হয়। হুড়মুড় করে পানি নেমে আসে বাংলাদেশের দিকে। সংগত কারণেই ডালিয়া ব্যারাজও খুলে দিতে হয়েছে। নদী খাত ছেড়ে স্রোত দিজ্ঞ্বিদিক ছুটেছে; যেদিক দিয়ে গেছে, সবকিছু ভাসিয়ে ও খুঁড়ে নিয়ে গেছে।

বিপুল প্রবাহের কারণে কিন্তু এমন পরিণতি নয়। মাঝারি দৈর্ঘ্যের নদীতে পরপর দুটি ব্যারাজ থাকার কারণে তিস্তায় তলানি প্রবাহ বা ‘সিল্ট’ আটকে থাকে। নদীটির খাত ক্রমেই উঁচু হচ্ছে। যে কারণে সামান্য বন্যার পানিও আর ধরে রাখতে পারে না। দেখা দেয় প্রবল ভাঙন। যদি ব্যারাজ দুটি না থাকত, তাহলে প্রাকৃতিকভাবেই তিস্তার গভীরতা বেশি থাকত। হেমন্তকালে উজানে অতিবর্ষণ হলেও এর জের ধরে বন্যা দেখা দিত না। তিস্তার পানি নদী খাত বেয়ে ব্রহ্মপুত্রে চলে যেত।

দ্বিতীয়ত. তিস্তা অববাহিকাজুড়ে, বিশেষত উজানে ভারতের অংশে যততত্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং এর জের ধরে বিসবুজীকরণ গোটা পাহাড়ি অঞ্চলকে নাজুক করে তুলেছে। পাহাড়গুলো আর আগের মতো করে ‘টপ সয়েল’ ধরে রাখতে পারছে না। বৃষ্টির পানি গড়িয়ে নদীতে নামার সময় অনেক বেশি পলল নিয়ে আসছে। সেগুলো বন্যার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যার পানি যতদূর যায়, ততদূর। কেবল তাৎক্ষণিক ফসলের ক্ষতি নয়; দীর্ঘ মেয়াদে আবাদি জমিও বিনষ্ট হচ্ছে। এর ফলে খোদ নদীতে মৎস্যসম্পদেরও যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, বলা বাহুল্য।

এতে কেবল ভাটির অংশে বাংলাদেশের ক্ষতি নয়, উজানে ভারতের অংশেও একইভাবে বন্যা দেখা দিচ্ছে, ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, আবাদি জমি বিনষ্ট হচ্ছে। এমনকি পাহাড়ি অংশেও দেখা দিচ্ছে ঘন ঘন ভূমিধস। সেখানে আগের তুলনায় অনেক বেশি সড়ক, সেতু, ভবনসহ কংক্রিটের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে। এর ফলে যেমন সম্পদহানি, তেমনি প্রাণহানিও বাড়ছে। এবারের বন্যা বাংলাদেশে যেমন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, ভারতের পাহাড়ি অংশেও তেমন সবকিছু যেন ভেঙে ফেলছিল। যত দিন যাবে, এভাবে নদী অববাহিকায় বিসবুজীকরণের বিপদ আরও স্পষ্ট হতে থাকবে।

তৃতীয়ত. তিস্তা অববাহিকার এই অকাল বন্যাকে কেবল ব্যারাজ ও ড্যামের আপদ, বিসবুজীকরণের কারণে তলানি প্রবাহ বৃদ্ধি, নদী খাত ভরাট হওয়ার কারণে সামান্য প্রবাহেই প্রবল বন্যা দিয়ে বিশ্নেষণ করা যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদও মনে রাখতে হবে। এর অভিঘাতে হিমালয় অঞ্চলজুড়েই যে ‘ক্লাউড বার্স্ট’ বা মেঘভাঙা বৃষ্টি বাড়বে- এই হুঁশিয়ারি বিজ্ঞানীরা বেশ কয়েক বছর ধরেই উচ্চারণ করে আসছেন। এবার তিস্তা অববাহিকায় সেটাই ঘটেছিল- স্বল্পতম সময়ে, নির্দিষ্ট এলাকাজুড়ে প্রবল বর্ষণ। যার ফলে নদীতে প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে তলানি প্রবাহের স্রোত বৃদ্ধি এবং নদী খাত উঁচু হয়ে বিপর্যয়ের ষোলকলা পূর্ণ করেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, আগামীতে এ ধরনের বন্যার সমাধান কী? সোজা কথায় বলে দেওয়া যায়, নদীকে নদীর মতো থাকতে দিতে হবে। ব্যারাজ বা ড্যামের মতো স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। তিস্তা অববাহিকাজুড়ে যত্রতত্র স্থাপনা নির্মাণ এবং বিসবুজীকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। কিন্তু বলা যত সহজ, বাস্তবায়ন তত সহজ নয়।

তাহলে, মূলত উজানের অংশের অবিমৃষ্যকারিতায় তিস্তার ভাটি অঞ্চল এভাবে অকাল বন্যায় জেরবার হতেই থাকবে? নদীবর্তী মানুষের জীবন ও সম্পদহানির ক্ষতিপূরণই বা কে দেবে?

এ ক্ষেত্রে সমাধান হতে পারত একটি রক্ষাকবচ, যার নাম সংক্ষেপে ‘জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ সনদ ১৯৯৭’। এই সনদ অনুযায়ী ভাটির দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে- এমন কোনো পদক্ষেপ উজানের দেশ নিতে পারবে না। ভাটির দেশকে না জানিয়ে ব্যারাজের মতো স্থাপনার জলকপাট খুলে দেওয়ার মতো উদ্যোগও নিতে পারবে না। জানানোর পরও যদি উজানের দেশের পদক্ষেপের কারণে ভাটির দেশের ক্ষতি হয়; ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। বড় কথা, উজান ও ভাটির পক্ষ মিলেই নদনদীর অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। যাতে ক্ষতি দূরে থাক, বরং সুফল ভাগাভাগির পথ খুলে যাবে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘে এই সনদের পক্ষে ভোট দিয়েছে; কিন্তু দেশে ফিরে সংসদে অনুসমর্থন করেনি। কেন করেনি- সেটা একটি বড় প্রশ্ন।

লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল ( সংবাদ সমকাল )

Print Friendly, PDF & Email