৫০ বছরে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

প্রকাশিত: ১০:২৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২০, ২০২১

মো. আশরাফুল ইসলাম

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের তাজা রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি। তলাবিহীন ঝুড়ির উপাধি পাওয়া সেই দেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, মাথাপিছু আয় প্রভৃতি সূচকে বেশ উন্নতি সাধন করেছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে এদেশের মানুষ অনেক কিছু পেয়েছে। অন্যদিকে গণতন্ত্র, সুশাসন, জাতীয় ঐক্য, সমতা প্রভৃতি সূচকে এদেশের মানুষের প্রত্যাশা এখনও পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্যই ছিল রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি তথা জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদির পূর্ণ বাস্তবায়ন। সংবিধানে বলা আছে, বাংলাদেশ হবে এমন একটি দেশ যেখানে থাকবে না শোষণ, বৈষম্য, নির্যাতন ও বঞ্চনা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ সবাই মিলেমিশে বসবাস করবে। বিজয়ের ৫০ বছরে এসে সেই স্বাধীনতার কতটুকু সুফল ভোগ করতে পেরেছে এদেশের মানুষ? কতটুকু পূরণ হয়েছে তাদের প্রত্যাশা? আজ সকলের কাছে সেটি অনেক বড় একটি প্রশ্ন।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন এদেশের মানুষ নতুনভাবে স্বপ্ন দেখা শুরু করে। নবগঠিত বাংলাদেশের কাছে তারা অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। তাদের চাওয়া পাওয়ার বিষয়গুলো ছিল-
(ক) বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।
(খ) মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ তথাঃ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে এবং সমাজের সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হবে।
(গ) মুক্তচিন্তা চেতনা সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
(ঘ) সকল নাগরিকের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
(ঘ) ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারসমূহ নিশ্চিত হবে।
(ঙ) বাঙালির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন সেটি ছিল ভঙ্গুর অর্থনীতির একটি দেশ। উন্নয়নের সব সূচকে পিছিয়ে ছিল। ১৯৭২ সালে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইয়ং ফায়ারল্যান্ড এবং জে আর পারকিন্সনও বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলেছিলেন। যেমন-
(ক) বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশ্বের কঠিনতম সমস্যার একটি।
(খ) বাংলাদেশের উন্নয়ন হলে সব দেশেরই উন্নয়ন সম্ভব হবে।
(গ) বাংলাদেশের উন্নয়ন যদিও হয়, তাহলে অন্তত ২০০ বছর লাগবে।
অন্যদিকে এডওয়ার্ড অস্টিন রবিনসনও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না।

সব অভিসম্পাত ও আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ আজ ঘুরে দাড়িয়েছে। আর্থ-সামাজিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ যে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে সে কথা অমর্ত্য সেন তার Uncertain Glory বইতে বলেছেন। ২০০ বছর নয়, বরং ৫০ বছরে বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে তাতে সারা বিশ্ব এখন বলছে ‘সাবাস বাংলাদেশ।’

স্বাধীনতা আমাদেরকে দিয়েছে আত্মমর্যাদা, আত্মপরিচয়। লাল সবুজের পতাকা, সার্বভৌমত্ব এবং সবুজ পাসপোর্ট এই স্বাধীনতারই অংশবিশেষ। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আমরা অনেক কিছুই পেয়েছি। বাংলাদেশের প্রথম যোগাযোগ ও সম্প্রচার কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ তাদের মধ্যে অন্যতম। এটি ১১ মে, ২০১৮ সালে কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এই উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে ৫৭ তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হয় বাংলাদেশ।

শতভাগ বিদ্যুতায়নের এই লম্বা পথটি বাংলাদেশ পাড়ি দিয়েছে একেবারেই শূন্য থেকে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বলতে তেমন কোন কিছুই ছিল না। জাতির পিতা ৩০০ মেগাওয়াট বিদুৎ সক্ষমতা নিয়ে এর উৎপাদন শুরু করেন। সেটিই এখন ৩০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বের রোল মডেল হয়ে ওঠেছে বাংলাদেশ। ঘরে-বাইরে, রাষ্টীয় কর্মকান্ডে সর্বত্রই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। BBS এর সর্বশেষ তথ্যমতে, বর্তমানে মানুষের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৭ ডলার। যা পূর্বের অর্থবছরের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। তাছাড়া মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ সেতু প্রভৃতি প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান রয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ১৯৭০-৭১ সালে দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল ১০ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ টনে। বর্তমানে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে এদেশে প্রায় অর্ধেক মানুষ হতদরিদ্র ছিল। তখন হতদরিদ্রের হার ছিল ৪৮ শতাংশ। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১.৮ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার কমে ১১ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এখন এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকারে গত দুই যুগে সিঙ্গাপুর ও হংকংকে ছাড়িয়ে আজকের অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে তথ্য সেবায় বেশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তথ্য সেবাকে  মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেশের ৪৫৫০ টি ইউনিয়ন পরিষদে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ওয়েব পোর্টাল। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত এ পোর্টের সংখ্যা প্রায় ২৫০০০। ইতোমধ্যে দেশের সব উপজেলাকে আনা হয়েছে ইন্টারনেটের আওতায়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বেড়েছে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার। সরকার প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনামূল্যে বই দিচ্ছে পাশাপাশি সকল শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলে ছাত্র-ছাত্রী ঝড়ে পড়ার হার অনেক কমে এসেছে। স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্থাপন করা হয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক। বর্তমানে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সেখানে ২৭ রকমের ঔষধ সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশে শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বাংলাদেশে বিগত ২০ বছরে শিশু মৃত্যুহার ৬৩ শতাংশ কমেছে। এমনকি শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। এক সময়কার শুধুমাত্র পাট ফলানো, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত, তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ নামের এই দেশটি আজ বিশ্ব দরবারে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এ দেশটিই হতে যাচ্ছে ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।

বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন এদেশের মানুষের বেশ কিছু চাওয়া বা প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও এদেশের মানুষের বেশ কিছু প্রত্যাশা পুরোপুরি সফলতার মুখ দেখেনি। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, হামলা-মামলা, জায়গা জমি দখল রয়েই গেছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও সরকারি দলের সাথে অন্যান্য দলের সম্পর্ক দা-কুমড়ার মতোই রয়ে গেছে। দুর্নীতি চিরতরে নির্মূল হোক এটি এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু কোনভাবেই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

এক গবেষণায় এসেছে বাংলাদেশে ৩% মানুষের কাছে ৯০% সম্পত্তি কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। অবশিষ্ট ৯৭% মানুষ ১০% সম্পত্তি ভোগ করছে। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মাঝে অর্থনৈতিক বৈষম্য খুবই প্রকট। এতে কর ধনী আরও সম্পদশালী হচ্ছে আর গরীব আরও দরিদ্র হচ্ছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে ওঠেনি। গণতন্ত্র শক্তিশালী না হওয়ায় জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মাথা ছাড়া দিয়ে ওঠেছে। যে চেতনাকে ধারণ করে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে স্বাধীনতার ৫০ বছরে? অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এখনও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হয়নি। উচ্চ আদালত, প্রশাসনসহ সর্বত্র এখনও ইংরেজির দাপট।এখনো বাংলায় রায় দেওয়ার রীতি চালু হয়নি। এমনকি ব্যবস্থাপত্র পর্যন্ত লেখা হয় ইংরেজিতে। সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, বিজ্ঞাপনে ইংরেজির ছড়াছড়ি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে আইনের শাসন শুধু বিচারক ও আইনজীবীদের সাথেই সম্পৃক্ত নয়। এর সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে জনগণের ন্যায়বিচার, শান্তি, সম্মান আর সমঅধিকার পাওয়ার বিষয়।

এদেশের মানুষ এখনও স্বপ্ন দেখে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ আবারও একটি সত্যিকারের শোষণমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, বঞ্চনামুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র হবে। বিশ্ব দরবারে সম্মানের সহিত মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। যেখানে শত ফুল ফুটবে, শত পাখি গাইবে বিজয়ের গান। স্বাধীনতার সুবাতাসে ভরে উঠবে প্রতিটি নাগরিকের প্রাণ।

লেখক.
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

Print Friendly, PDF & Email