উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী জেলা লালমনিরহাট

প্রকাশিত: ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৩, ২০২০

প্রবাদ আছে লাল ,নীল ,কুড়ি,গাই ,এইনিয়ে বৃহত্তর রংপুরের পরিচয় পাই। অর্থাৎ লালমনিরহাট নীলফামারী কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা নিয়েই রংপুর। এরমধ্যে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী জেলা লালমনিরহাট।

১৯৮৪সালে ১ ফেব্রুয়ারি আটটি থানা নিয়ে গঠিত হয় লালমনিহাট জেলা। যদিও এর উপজেলা পাটগ্রাম হাতীবান্ধা কালিগঞ্জ আদিতমারী লালমনিরহাট সদর এই পাঁচটি। এর উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি জেলা , দক্ষিনে রংপুর জেলা ,পূর্বে কুড়িগ্রাম এবং পশ্চিমে নীলফামারী রংপুর জেলা।

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন লালমনিরহাট জেলা। আধুনিক তিস্তা ব্যারেজ, ইতিহাসখ্যাত তিনবিঘা করিডর, ছিট মহল, শালবন ,মন মাতানো ভাওয়াইয়া গান এ জেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

আলোকিত ক্ষমতা সম্পূর্ণ বহু পীরের মাজার, প্রাচীন মসজিদ, ও মন্দির এ জেলার গৌরব। তিস্তা ধরলা বিধৌত সবুজ-শ্যামল লীলাভূমি লালমনিরহাট।

তিনবিঘা করিডর ও ছিট মহল:- এই করিডোরের বিস্তৃতি মাত্র ১৭৮*৮৫ মিটার। দীর্ঘদিন এর মালিকানা অমীমাংসিত থাকার কারণে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমহলের জনগণ ছিল অবরুদ্ধ। ১৯৯২ সালের ২৬ জুন ছিটমহলের অধিবাসীরা লাভ করে প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে যাতায়াতের সুযোগ। এখানে প্রতিষ্ঠা রোটারি ভিলেজ একটি দর্শনীয় স্থান। বর্তমান সরকার ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে ৬৮ বছরের বন্দিদশা মুক্ত করেছে ছিটমহল বাসীকে।

তিস্তা ব্যারেজঃ- প্রমত্তা নদী তিস্তা যুগ যুগ ধরে চালিয়েছিল নদীর একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ার খেলা। ভারত থেকে নেমে আসা ও স্রোতস্বিনী তিস্তার   উদ্ধত্য জলরাশিকে জনকল্যাণে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এর গতিপথে নির্মিত হয়েছে বিশাল বাঁধ।

বাস্তবায়িত হয়েছে দূর-দূরান্তে সেচের পানি পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক মহাপরিকল্পনা। বাধের সঙ্গে সন্নিবেশিত হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের অনুপম নজির। বাধ নিয়ন্ত্রণ অবকাশ যাপনের জন্য স্থাপিত হয়েছে বিশাল শৈল্পিক কারুকার্য খচিত আধুনিক বাংলা অবকাশ। বিশেষ আলোচিত এই ব্যারেজের দৈর্ঘ্য ৬১৫ মিটার থেকে সুবিধা প্রান্ত এলাকা হলো৭.৪৯ লাখ হেক্টর জমি।

বুড়িমারী জিরো পয়েন্ট:- পাটগ্রাম থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের সীমান্তে অবস্থিত জেলার একমাত্র স্থল বন্দর বুড়িমারী জিরো পয়েন্ট।

ধরলা নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে এ বন্দরটি এ পথ বেয়েই ভারত নেপাল ভুটান থেকে আঙ্গুর আপেল কমলা লেবু পাথর ও সিমেন্ট বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।

তুষভান্ডার ও কাকিনা জমিদার বাড়ি:-তুষভান্ডার রাজবাড়ির প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ, মোঘল বংশের রাজাদের প্রতিষ্ঠিত স্কুল, মন্দির দাতব্য চিকিৎসালয় ও মসজিদ ইত্যাদি ও দর্শনীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত।

কাকিনার প্রজাহিতৈষী বিদ্যোৎসাহী রাজন্যবর্গ বসবাস করতেন। প্রাচীন রাজবাড়ী সমূহের বেশকিছু ধ্বংসাবশেষ রাজবংশের কীর্তি এখনো পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

এছাড়াও রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত বিমানবন্দর। সুবিশাল দর্শনীয় এই বিমান ঘাঁটির জমির পরিমাণ ১ হাজার ১৬৬.৬৮ একর।লালমনিরহাট শহরে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপাসনার লক্ষে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুটি আধুনিক গির্জা। দর্শনীয় স্থান সমূহের মধ্যে আরো রয়েছে পাটগ্রামে ইতিহাসখ্যাত পাটেশ্বরী মন্দির। মোগলহাটের এবাদত কার কুচবিহার অভিযানের সময় ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল ছাউনি স্থাপনের জন্য লালমনিির হাট জেলার একটি স্থান মোগলহাট সেখানে ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে নুর উদ্দিনের নেতৃত্বে কৃষক বিদ্রোহের সূচনা হয়। আছে বুদ্ধেরশ্বরী  মন্দির। রাজা কান্তেশ্বর পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই মন্দির স্থাপন করেন। প্রতিবছর পুরো কার্তিক মাসব্যাপী মেলা হয় এখানে। মন্দির সংলগ্ন বিশাল পুকুর হচ্ছে এই মেলার দর্শনীয় স্থান। পীর ফকিরের মাজার রয়েছে এই লালমনিরহাটে। এরমধ্যে শাহ কবির (রহঃ) ও শাহ বোগদাদী (রহঃ)  পীর শাহ শাওয়াল এর মাজার সহ অন্যান্য মাজারে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে।

এ জেলায় তিস্তা নদীর উপর গড়ে ওঠেছে তিনটি সেতু। হাতীবান্ধা উপজেলা হতে নীলফামারী জেলার সংযোগ স্থাপনে নির্মিত তিস্তাব্যারেজ। এখানে দুর দূরান্তের লোকজন এসেও ভীর জমায়। কালীগঞ্জ উপজেলা হতে গংগাচড়া উপজেলায় সংযোগ স্থাপনে নির্মিত হয়েছে গংগাচড়া শেখ হাসিনা সেতু, রয়েছে তিস্তা সড়ক সেতু। এ সকল সেতুগুলোতে বিকেল হলেই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের ঢল নেমে থাকে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে এই অঞ্চলের কমান্ডিং অফিসারের সমন্বয় গড়ে তোলা হয় লালমনিহাট কলেজ। বাংলাদেশ রেলওয়ে লালমনিরহট ডি আর এম অফিস সংলগ্ন দক্ষিণ দিকে রয়েছে গণকবর। মুক্তিযুদ্ধে লালমনিহাট জেলা সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হয় 6 ডিসেম্বর ১৯৭১। জেলা হিসেবে লালমনিরহাটের বয়স কম হলেও সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে রয়েছে এ জেলার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। সীমান্তবর্তী এ জেলায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের দিকে। ইতিমধ্যে লালমনিহাট ২(আদিতমারি-কালিগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচিত মাননীয় সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলহাজ্ব নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি মহোদয়ের একান্ত প্রচেষ্টা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় লালমনিরহাট জেলাকে বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি আদর্শ জেলা হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক-নূর আলমগীর অনু, সম্পাদক (দৈনিক মুক্তি)

Print Friendly, PDF & Email